মালদ্বীপ হলো বিষুবীয় ভারত মহাসাগরে ছড়িয়ে থাকা ২৬টি প্রাকৃতিক অ্যাটল ও প্রায় ১,১৯০টি প্রবাল দ্বীপের এক শৃঙ্খল। আরব, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যুক্ত করা প্রাচীন সমুদ্রপথের মাঝখানে অবস্থানের কারণে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এ দেশের ইতিহাস গড়ে উঠেছে। এই পথ ধরেই এসেছে বণিক, নতুন ধর্ম, আর কখনো কখনো বিদেশি শক্তি।
প্রথম বসতি
মানুষ ঠিক কবে প্রথম এই দ্বীপগুলোতে পৌঁছেছিল, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। ভাষা, লোককথা ও রীতিনীতি ইঙ্গিত দেয় যে প্রথম বসতি স্থাপনকারীরা এসেছিলেন দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে, সম্ভবত নিকটতম উপকূল থেকে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া জেলে সম্প্রদায়।
এই প্রথম দ্বীপবাসীরা কাঠ, খড়-পাতা ও এমন সব উপকরণ দিয়ে ঘর বানাতেন যা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় বেশি দিন টেকে না। তাই প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য তাঁরা খুব কম চিহ্ন রেখে গেছেন। টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো ধ্বংসাবশেষগুলো পরবর্তী বৌদ্ধ যুগের।
বহু শতাব্দী ধরে বিদেশে এই দ্বীপগুলোর পরিচিতি ছিল কড়ির জন্য, যা মালদ্বীপবাসীরা সংগ্রহ করে রপ্তানি করতেন। এশিয়ার বড় অংশে এবং পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে কড়ি মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো, ফলে বণিকদের কাছে অ্যাটলগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাবিরতির স্থান।
বৌদ্ধ যুগ
বৌদ্ধধর্ম সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব শেষ কয়েক শতকে অথবা খ্রিস্টীয় প্রথম কয়েক শতকে মালদ্বীপে পৌঁছায় এবং হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রধান ধর্ম হিসেবে টিকে থাকে। ধিবেহি ভাষা, এর প্রাচীনতম লিপি এবং রাজশাসনের বহু রীতি ও প্রতিষ্ঠানসহ মালদ্বীপের জীবনের অনেক কিছুই এই যুগে রূপ পায়।
ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গুরুতর গবেষণা শুরু করেন সিলোন সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ কর্মকর্তা এইচ. সি. পি. বেল। ১৮৭৯ সালে মালদ্বীপে তাঁর জাহাজডুবি হয় এবং পরে তিনি প্রাচীন স্থানগুলো জরিপ করতে ফিরে আসেন। স্থানীয়ভাবে হাভিত্তা, হাত্তেলি বা উস্তুবু নামে পরিচিত গাছপালায় ঢাকা ঢিবিগুলো আসলে স্তূপ ও বিহারের ধ্বংসাবশেষ বলে প্রমাণিত হয়।
১৯৯০ সালে মালদ্বীপের ইতিহাসবিদ হাসান আহমেদ মানিকু বৌদ্ধ নিদর্শনযুক্ত ৫৯টি দ্বীপের তালিকা করেন। সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে লামু অ্যাটলের গান দ্বীপে কুরুহিন্না থারাগান্ডু এবং কাফু অ্যাটলের কাশিধু দ্বীপে বিহারের ধ্বংসাবশেষ। মালের জাতীয় জাদুঘরে রাখা প্রবাল-খোদাই ও লিপিযুক্ত নিদর্শন শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি মূল ভারতের বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়।
১৯৮০-র দশকে নরওয়েজীয় অভিযাত্রী থর হেয়ারডাল কয়েকটি স্থানে খননকাজ চালান এবং প্রস্তাব করেন যে বৌদ্ধদের আগে সূর্য-উপাসক এক সমুদ্রচারী জনগোষ্ঠী এই দ্বীপগুলোতে বাস করত। তাঁর তত্ত্ব ব্যাপক মনোযোগ পেলেও অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক তাঁর অনুসন্ধান করা ধ্বংসাবশেষগুলোকে বৌদ্ধ যুগের বলেই মনে করেন।
ইসলাম গ্রহণ (১১৫৩)
দ্বাদশ শতকে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যে আরব ও পারস্যের বণিকদের প্রাধান্য ছিল। ১১৫৩ সালে রাজা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সুলতান মুহাম্মদ আল-আদিল নাম নেন। কিছু তাম্রলিপিতে এর চেয়ে কয়েক বছর পরের তারিখ পাওয়া যায়।
এই ধর্মান্তরের কৃতিত্ব দেওয়া হয় আবুল বারাকাত নামে পরিচিত এক সফররত মুসলিম আলেমকে। পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁকে উত্তর আফ্রিকার একজন বার্বার বলে বর্ণনা করেছেন, অন্যদিকে মালদ্বীপের ঐতিহ্যে প্রায়ই তাঁকে তাবরিজের ইউসুফ শামসুদ্দিন বলে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর সমাধি মালেতে হুকুরু মিসকি বা পুরোনো জুমা মসজিদের কাছে অবস্থিত। খোদাই করা প্রবাল-পাথরে তৈরি এই মসজিদটি সুলতান প্রথম ইব্রাহিম ইস্কান্দারের আমলে ১৬৫৮ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
দ্বাদশ শতকে তামার পাতে খোদাই করা রাজকীয় অনুদানপত্র ইসদু লোমাফানু ধিবেহি ভাষায় লেখা টিকে থাকা প্রাচীনতম দলিলগুলোর অন্যতম, এবং এতে ধর্ম পরিবর্তনের কথা লিপিবদ্ধ আছে। এই পাতগুলোতে বৌদ্ধ বিহার ভেঙে ফেলার বর্ণনা থাকায় কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, রূপান্তরটি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল না।
ইবনে বতুতা নিজেও ১৩৪০-এর দশকে মালদ্বীপে বসবাস করেন এবং কাজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১১৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সালতানাত ছয়টি রাজবংশের অধীনে ৮০০ বছরেরও বেশি টিকে ছিল।
পর্তুগিজ ও মুহাম্মদ ঠাকুরুফানু
১৫৫৮ সালে পর্তুগিজরা মালে দখল করে এবং গোয়ার উপনিবেশ থেকে তা শাসন করে। তাদের শাসন ছিল তীব্রভাবে অপছন্দের, এবং দ্বীপবাসীদের ধর্ম ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
১৫৭৩ সালে হা আলিফু অ্যাটলের উথিমু দ্বীপের মুহাম্মদ ঠাকুরুফানু ও তাঁর ভাইয়েরা সমুদ্র থেকে অভিযান চালিয়ে পর্তুগিজদের মালে থেকে বিতাড়িত করেন। তিনি সুলতান হন, এবং এই বিজয় প্রতিবছর ইসলামি মাস রবিউল আউয়ালের প্রথম দিনে জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়। তাঁর পারিবারিক বাসভবন উথিমু গান্ডুভারু স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
ওলন্দাজ ও ব্রিটিশ সুরক্ষা (১৮৮৭)
সপ্তদশ শতকে সিলোনে পর্তুগিজদের জায়গা নেওয়া ওলন্দাজরা মালদ্বীপের ব্যাপারে আলগা প্রভাব রাখলেও অভ্যন্তরীণ শাসনভার সুলতানদের হাতেই ছেড়ে দেয়। ১৭৯৬ সালে ব্রিটিশরা ওলন্দাজদের কাছ থেকে সিলোন দখল করলে সেই সম্পর্ক তাদের হাতে আসে।
১৮৮৭ সালে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে মালদ্বীপ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেয় ব্রিটেন, আর সুলতান ও তাঁর মন্ত্রীরা ইসলামি আইন ও স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ বিষয় পরিচালনা করতে থাকেন।
১৯৩২ সালে সুলতান তৃতীয় মুহাম্মদ শামসুদ্দিনের শাসনামলে প্রথম লিখিত সংবিধান চালু হয় এবং সুলতানের পদ নির্বাচনভিত্তিক হয়ে ওঠে।
প্রথম প্রজাতন্ত্র (১৯৫৩) ও আমিন দিদি
১৯৫৩ সালের ১ জানুয়ারি রাজতন্ত্র স্থগিত করে প্রথম প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয় এবং মোহাম্মদ আমিন দিদি রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৪০-এর দশকে সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে তিনি মাছ রপ্তানি বাণিজ্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনেন। শিক্ষার প্রসার, মেয়েদের শিক্ষায় উৎসাহ এবং প্রশাসনের আধুনিকায়নের জন্য তাঁকে স্মরণ করা হয়।
তবে তাঁর সরকার টেকেনি। খাদ্য সংকট ও মালেতে বিরোধিতার কারণে ১৯৫৩ সালের আগস্টে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয় এবং ১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে তিনি মারা যান। সেই বছরই সালতানাত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
সুভাদিভ অধ্যায়
১৯৫৬ সালে ব্রিটেন আড্ডু অ্যাটলের গান দ্বীপে তার যুদ্ধকালীন বিমানঘাঁটি আবার চালু করার এবং পাশের হিথাধু দ্বীপে স্থাপনা রাখার অনুমতি পায়। ১৯৫৭ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়া ইব্রাহিম নাসির চুক্তির শর্ত নতুন করে আলোচনার জন্য চাপ দেন।
১৯৫৯ সালে দক্ষিণের তিনটি অ্যাটল হুভাধু, আড্ডু ও ফুভাহমুলাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে আবদুল্লাহ আফিফকে রাষ্ট্রপতি করে ইউনাইটেড সুভাদিভ রিপাবলিক ঘোষণা করে। ব্রিটিশ ঘাঁটিকে ঘিরে কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যে দক্ষিণাঞ্চল সমৃদ্ধ হয়েছিল এবং মালের নিয়ন্ত্রণে সেখানকার মানুষ অসন্তুষ্ট ছিল।
মালের সরকার পুনরায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৬৩ সালের মধ্যে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রটি বিলুপ্ত হয়। আফিফ সেশেলসে নির্বাসনে চলে যান।
স্বাধীনতা (২৬ জুলাই ১৯৬৫) ও দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র (১৯৬৮)
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এক চুক্তির মাধ্যমে ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই মালদ্বীপ পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে এবং সে বছরই জাতিসংঘের সদস্য হয়। গান ও হিথাধুর স্থাপনা ব্যবহারের অধিকার ব্রিটেনের হাতে থেকে যায়।
১৯৬৮ সালের মার্চে এক গণভোটে মালদ্বীপবাসী সালতানাত বিলুপ্তির পক্ষে রায় দেন। ১৯৬৮ সালের ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয় এবং ইব্রাহিম নাসির রাষ্ট্রপতি হন।
নাসিরের শাসনকাল
নাসির এক দশক দেশ শাসন করেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে একচ্ছত্র প্রভাব রাখেন। তাঁর সরকার আধুনিকায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়, এবং ১৯৭২ সালে প্রথম পর্যটন রিসোর্টগুলো চালু হয়, যা পরবর্তীতে অর্থনীতিকে বদলে দেওয়া শিল্পের সূচনা করে।
এই দশকে কষ্টও এসেছিল। মালদ্বীপের শুঁটকি মাছের শ্রীলঙ্কান বাজার ভেঙে পড়ে, এবং ১৯৭৬ সালে ব্রিটেন গান ঘাঁটি বন্ধ করলে দক্ষিণের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। ক্ষমতা ছিল কঠোরভাবে কেন্দ্রীভূত; ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী আহমেদ জাকিকে পদ থেকে সরিয়ে একটি দূরবর্তী দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।
১৯৭৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে নাসির পদ ছেড়ে সিঙ্গাপুরে চলে যান। পরবর্তী সরকার তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ আনে। ২০০৮ সালে সিঙ্গাপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।
গাইয়ুম ও ১৯৮৮ সালের হামলা
সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষক এবং জাতিসংঘে মালদ্বীপের প্রতিনিধিত্বকারী মামুন আবদুল গাইয়ুম ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একক প্রার্থীর গণভোটের মাধ্যমে তিনি আরও পাঁচ মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হন এবং ৩০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। পর্যটন ও মৎস্য খাত দ্রুত বিকশিত হয়।
১৯৮৮ সালের ৩ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার তামিল জঙ্গি সংগঠন প্লট (PLOTE)-এর সশস্ত্র সদস্যরা ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে মালেতে অবতরণ করে। এই ষড়যন্ত্রের আয়োজন করেছিলেন মালদ্বীপের ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ লুতুফি ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী। হামলাকারীরা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থান দখল করলেও রাষ্ট্রপতিকে আটক করতে ব্যর্থ হয়।
সরকারের অনুরোধে ভারত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘অপারেশন ক্যাকটাস’ নামে প্যারাট্রুপার পাঠায়। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় এবং পালাতে থাকা হামলাকারীদের পরে ভারতীয় নৌবাহিনী সমুদ্রে আটক করে। প্রায় ১৯ জন নিহত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। লুতুফি ও আরও কয়েকজন মালেতে দোষী সাব্যস্ত হন এবং পরে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড লঘু করা হয়।
২০০৮ সালের সংবিধান ও প্রথম বহুদলীয় নির্বাচন
২০০০-এর দশকের শুরুতে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়। ২০০৩ সালে মাফুশি কারাগারে এক তরুণ বন্দির মৃত্যুর পর মালেতে বিক্ষোভ শুরু হয়, এবং ২০০৪ সালের ডিসেম্বরের ভারত মহাসাগরীয় সুনামি বহু দ্বীপ বিধ্বস্ত করে। ২০০৫ সালে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হয়।
২০০৮ সালের ৭ আগস্ট অনুমোদিত নতুন সংবিধান রাষ্ট্রের ক্ষমতা পৃথক করে, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং নাগরিকদের বিস্তৃত অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। ২০০৮ সালের অক্টোবরে দেশটি প্রথম বহুদলীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করে।
মালদিভিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মোহাম্মদ নাশিদ দ্বিতীয় দফার ভোটে গাইয়ুমকে পরাজিত করেন এবং ২০০৮ সালের ১১ নভেম্বর শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে এক রাষ্ট্রপতির তিন দশকের শাসনের অবসান ঘটে।